Scrollwhite

মাহমুদুল হক ফয়েজ My name is Mahmudul Huq Foez, I am a journalist, leaving in a small town, named Noakhali , which is situated in coastalzila of Bangladesh

হোমপেইজ | আর্টিকেল | ছোটগল্প | ফিচার | মুক্তিযুদ্ধ | বনৌষধি | সুস্বাস্থ্য | কবিতা | যোগাযোগ

বাদামের খোসা


বাদামের খোসা
মাহমুদুল হক ফয়েজ


বাদাম ভরা এল্যুমেনিয়ামের বড় ভান্ড। দু দিক দিয়ে গামছা বাঁধা। সে গামছা গলায় বেঁধে আট বছরের মহিন উদ্দিন বা দাম বিক্রি করে। বিক্রির টাকায় চলে তাদের সংসার নোয়াখালীর মাইজ দি শহরে কোর্ট বিল্ডিং আদালত পাড়া, বড়মসজিদ,স্কুল এসব জায়গাতেই তার পসরা নিয়ে ঘুরা ঘুরি


মুখে তার এখনো ভালো করে বোল ফোটেনি। মায়াবী এক শান্ত চেহারার মহিন মাইজদী শহর থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে চরকরমুল্লা থেকে বাদাম নিয়ে এখানে আসে। ওরা দশ বার জনের একটি দল। মহিনই সবার ছোট। তার বাবা সিদ্দিক উল্লাহ(৫০) গ্রামে বদলা দেন। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বেশী কাজ করতে পারেননা। তারা মোট পাঁচ ভাই এক বোন। বড় দু’ ভাই শফিক(১৫) আর বাসার(১২) তারাও বাদাম বিক্রি করতো এখন আর করেনা। অন্য কাজ করে। তার ছোট দু’ভাই রিয়াজ(৪) আর ফার(২) বাড়িতে মায়ের কাছে থাকে। বোন সুরমার এখন তের বছর। এ বয়সেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। মা সুজিয়া খাতুন(৪০) বাড়িতে সংসার দেখাশুনা করেন। গ্রামে তাদের এক চিলতে জমি আছে। ওখানে দোচালা টিনের ঘর। গ্রামের নূরুল ইসলাম মিয়া নামের একজন থেকে দুইটি গরু বর্গা নিয়েছে তারা। মা সারাদিন সে গুলো দেখভাল করে।মাহিন প্রতিদিন দুইশ’ আড়াই শ’ টাকার বাদাম নিয়ে আসে। প্রতিদিন বিক্রি করে তার লাভ হয় আশি থেকে নব্বই টাকা। সারাদিন যত টাকা পায় সব তুলে দেয় তার মার হাতে। আদালত পাড়ার সামনেই মাইজদী বড় দীঘি। আদালতে মামলা মকদ্দমা সহ নানান কাজে প্রচুর মানুষ আসে এখানে। দীঘির পাড়ে গাছের নীচে প্রায় সারাদিন আনেক ভীড় থাকে। মহিন ওদের কাছে ছুটে যায় বাদামের পসরা নিয়ে।দীঘির পাড়ে বসে কথা হচ্ছিলো মহিনের সাথে। বাদাম কিনে মানুষ ঠিক ভাবে পয়সা দেয়?দেয়, কোনো অসুবিধা করেনা। কেউ কোনোদিন টাকা নাদিয়ে চলে গেছে? প্রশ্নটা শুনেই মহিন যেন একটু থমকে যায়।‘গ্যাছে, কয়দিন আগে একটা লোক চাইর টাকার বাদাম কিনি টাকা দিব কই আর দেয়ন’যে যায়গাটায় সেই বাদাম বিক্রি করেছিলো ঠিক সেদিকে তাকিয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে তুলতুলে থুতনিটা একটু উপরে তুলে অনেকটা অভিমানের সূরে বলছিলো মহিন। বুক থেকে ছোট্ট একটা শ্বাস উথলে উঠলো। কোনো অভিযোগও নয়, ক্ষোভও নয়। শুধু অভিমান। মানুষের প্রতি তার অগাথ বিশ্বাস। কারো টাকা কেউ আত্মস্যাৎ করতে পারেনা। সে মানুষটা তার কষ্টের টাকা কেমন করে মেরে দিলো, মহিন সেটা বুঝে উঠতে পারেনা। বাদাম বিক্রি করতে করতে কতবার তার বাবার বয়সী সে মানুষটাকে খুঁজেছে। শে সে বুঝতে পারলো সত্যিই লোকটা তাকে প্রতারণা করেছে। ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসছে সে চেহারাটা। কিন্তু মন থেকে হারিয়ে যায়নি সে মানুষটার প্রতারণার কথা, তার কষ্টের রোজগার সে চার টাকার কথা। তাদের বাড়ির কাছে ব্র্যাক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তো সে। মহিন বলে রুমি আপার স্কুল।স্কুলের বন্ধুরা, রুমি আপার কবিতা, কাগজ পেন্সিল বই এসবের কথা মনে পড়ে তার।‘স্কুল বন্ধ করলে কেন’?‘সে স্কুল থেইকা নাম কাইটা দিছে। বাবা কইছে আর যাওন লাইগবোনা’। ‘স্কুলে আবার পড়তে চাও’ ?চোখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মহিনের। কোনো সময় না নিয়েই জোর দিয়ে বলে উঠলো,‘হ, যামু, আবার পড়মু’ , যেন এখনই ছুট দেবে স্কুলের দিকে।তাহলে তোমার বাদাম কে বিক্রি করবে ? সংসার চলবে কেমন করে?হঠাৎ ধপ করে মলিন হয়ে গেলো মহিন। এতক্ষণ হয়তো স্কুলের সে পরিচিত ছবি গুলো তার মনের ক্যানভাসে ফুটে উঠেছিলো। পরক্ষনে একটা কষ্টের কালো পর্দা এসে ঢেকে দিলো সব।
মহিন একবার বাদাম গুলোর উপর হাত ছুঁয়ে নিল। উদাস হয়ে তাকাল দীঘির জলের দিকে। দীঘির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ উঠে। সে ঢেউয়ের সাথে সাথে মহিনের মনের গহিনেও ছোট ছোট ব্যথার ঢেউ জাগে। জলের মধ্যে আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ছায়া পড়ে। ঢেউয়ের সাথে সাথে সে আকাশটাও ভেঙ্গে চুরে যায়। অব্যক্ত বেদনায় মহিন নিজের ভিতর নিজেই কুঁকড়ে পড়ে। নীরব নির্বাক হয়ে যায় সে। কোনো কথা ফোটেনা তার মুখ দিয়ে।
ছোট্ট বাদাম ওয়ালা মহিনের মত কত মহিনের অব্যক্ত বেদনা গুমরে গুমরে উঠে তার খবর কেউ রাখেনা। মহিনের আকাশ ভরা স্বপ্নগুলো বাদামের খোসার মতই রাস্তার ধূলোয় গড়াগড়ি দেয়। আর জল কাদায় মিলিয়ে যায় কতশত মহিনের প্রাণ।


মাইজদি কোর্ট১৯ জুন,২০০৮

বাদামের খোসা

No comments:

Post a Comment

About Me

My photo
Mahmudul Huq Foez Free-lance journalist, Researcher.