Scrollwhite

মাহমুদুল হক ফয়েজ My name is Mahmudul Huq Foez, I am a journalist, leaving in a small town, named Noakhali , which is situated in coastalzila of Bangladesh

হোমপেইজ | আর্টিকেল | ছোটগল্প | ফিচার | মুক্তিযুদ্ধ | বনৌষধি | সুস্বাস্থ্য | কবিতা | যোগাযোগ

একটি কৃষি প্রকল্প একটি চিন্তা অনেক স্বপ্ন


একটি কৃষি প্রকল্প  একটি চিন্তা অনেক স্বপ্ন

মাহমুদুল হক ফয়েজ



একদিন এই বাংলা ছিল প্রাচুর্যে ভরা। গোলা ভরা ধান গোয়াল ভরা গরু মাঠ ভরা ফসল, পুকুর ভরা মাঠ। ঐশ্ব্যর্যের এক নীলা ক্ষেত্র ছিল এই দেশ। আজ তা কিংবদন্তি। এক আশ্চর্য গল্পের মত মনে হয়।




এই ঐশ্বর্যকে লুঠের জন্য কত দস্যু, ফরাসী মারাঠী, মগ, পর্তুগীজ, ইংরেজ, পাঞ্জবীরা এই দেশ বারবার ছোবলে ছোবনলে ক্ষত বিক্ষত করেছে। সর্বশান্ত করেছে এই সোনার দেশের সোনার মানুষদের তারা আছে নিজেদেরকে চিনতে পর্যন্ত পারছেনা। পথে প্রান্তরে আজ অসহায় নিরন্ন মানুষের মিছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী শোষনে শেষনে এই দেশ যেন ছোবলা ছাড়া আর কিচু নেই। মাঝে মাঝে এই রুগ্ন অসহায় বাঙ্গালি মানুষেরা শেষ চেষ্টা করে। বিপুল বিক্রমে নড়ে উঠে আবার দাঁড়াতে চায় আবার হৃত গৌরব ফিরে পেতে মরণ পন সচেষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু দমনের পথ এখন হয়ে উঠেছে ভিন্ন। বিভিন্ন ভাবে ছলে বলে কৌশলে ধমকে প্রহসনে এ দেশের মাথা গুড়িয়ে দিচ্ছে। দাবিয়ে রাখছে এক নিকৃষ্ট জীবের মতন।



পরাশক্তি এখন অসম্ভব পরাক্রম শালী শিল্প বিজ্ঞানে তারা এতই অগ্রগামী যে এখন তাদের সঙ্গে সামনা সামনী লড়ে যাওয়া এক দুরুহ ব্যপর। তবু লড়তে হবে তবু শেষ চেষ্টা করে যেতে হবে। সাথে সাথে লড়তে হবে, এ দেশের নব্য ফড়িয়া লুটেরা তাঁবেদার ভূঁইফোঁড় শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে।



দক্ষিন বাংলার সমুদ্র উপকুলীয় এক অঞ্চল নোয়াখালী। এক সময়ের ভূলুয়া। নানা কিংবদন্তি আর গল্পে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল। মেঘনা আর সমুদ্রের পাড়ে হওয়ায় বারবার বহিঃশত্রু জলদস্যূ আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে দুর্দান্ত সাহসী আর দুর্মদ হয়ে উছেছিল এই অঞ্চলের সাহসী মানুষগুলো। সবুজ বৃক্ষ সোনালী শস্য এই অঞ্চলের মানুষদের প্রাচুর্যবান করে তুলেছিল। কি দস্যু, কি রুক্ষ প্রকৃতি কারো কাছেই মাথা নত করেনি কোন দিন। শমশের গাজী আজো এলাকার এক প্রাণপ্রিয় পুরুষ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে মর্যাদার লড়াই করে স্বাধীনতার শিরা উঁচু করে এ দেশের চির স্বাধীন মানুষদের গৌরবান্বিত করে গেছে। তার সাথে সাথে প্রকৃতির কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে চির সবুজ আর সংবেদনশীল এক শান্ত হৃদয়। নোয়াখালী শহর ছিল প্রাচ্যের এক সৌন্দর্য নগরী। বর্তমান শতাব্দীর এক আধুনিক নগরী। সুন্দর ইমারত, প্রসস্ত রাস্তা পরিকল্পিত বজার জনপদ। জামে মসজিদ মন্দির, পুলিশ লাইন সবই ছিল। কালেক্টরেট জজ কোর্ট, ঘোড় দোড়ের মাঠ ছিল দখার মত। প্রমত্ত মেঘনা আর উত্তাল সাগর হঠাৎ যেন রোশে ফেটে পড়লো। একে একে বিলীন হতে থাকলো সুন্দর সুন্দর জনপদ। সাহসী মানুষেরা সোনার মানুষেরা শত চেষ্টা করে রুখতে চাইলো সমুদ্র, বাঁচাতে হবে দেশ, বাঁচাতে হবে মানুষ সম্পদ। একে একে সব প্রচেষ্টা যখন ব্যার্থ, শেষ চেষ্টা করে প্রকৃতির সাথে প্রাণ পন লড়াই শুরু করেলো সাহসী মানুষ। নদিকে বাধঁতে হবে। শুরু হলো নব উদ্দমে নদীর সঙ্গে সমুদ্রের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই। অবশেষে প্রমত্তা নদী বশে এলো। ভাঙন রোধ হলো। এ সাহসী যুদ্ধে নেতৃত্ব ছিলেন এ অঞ্চলের আত্বপত্যয়ী পুরুষ ওবায়দুল্লাহ ইঞ্জিনিয়র। অন্যদিকে ছিলেন কমরেড তোহা। কিন্তু ততক্ষনে প্রায় সব শেষ। ততদিনে নদী গর্ভে বিনীল হলো সমগ্র নোয়াখালী শহর। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়লো। একদিন যারা ছিল প্রাচুর্যবান আজ তারা সহায় সম্বল হীন। কিছুই রইল না আর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো সবাই চতুর্দিকে। যারা এ অঞ্চলের আশে পাশে রয়ে গেল তারা দারিদ্রের কবাঘাতে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকলো। অশিক্ষা দারিদ্র আর অবহেলার শিকারে পরিনত হল। কিন্তু প্রকৃতি যতই নির্মম হোক না কেন তার বিশাল স্নেহময় বুকে মানুষদের আবার কাছে টেনে নেয় পরম উত্তাপে। এ যেন তার এক পরম স্নেহ মাখা খেলা। প্রকৃতি তার উদার হস্ত আবার প্রসারিত করতে লাগলো। যত তাড়াতাড়ি সমগ্র অঞ্চল নদী গর্ভে বিলীন হলো ততধিত গতিতে আবার জেগে উঠলো জনপদ। হাজার হাজার একর চর জেগে উঠলো সমুদ্র বক্ষে। যত জন পদ ভাঙ্গলো তারচেয়ে বেশী আরো বেশী। নতুন নতুন চর আজো জাগছে। ভূখা নাঙা মানুষ গুলো শুরু করলো এবার চর দখলের প্রতিযোগীতা। কার আগে কে নেবে দখল। লোভী জোতদার আর ভূ-স্বামীরা গড়ে তুললো এক একটি লাটিয়াল বাহিনী। হিংস্র আর উন্মত্ততায় দখল করতে থাকলো নতুন জেগে উঠা চর। রক্তে রক্তে রঞ্জিত হল উর্ব্বর পলি সমৃদ্ধ নরম মাটি। নতুন গাজানো ঘা স স্নিগ্ধ শিশিরের স্পর্শ পাওয়ার আগেই সিক্ত হোল মানুষের উষ্ণ তাজা রাঙা খুনে। সেই পরিকল্পনা সঠিক নেতৃত্ব আর দিক দর্শনের অভাবে সীমাহীন ঐশ্যর্য ভান্ডারকে মানুষ কোন কাজেই লাগাতে পারলো না। যা কিছুই হচ্ছে সবই অপরিকল্পিত ভাবে। অসহায় শ্রমজীবি মানুষগুলো স্তানীয় টাউট আর শোষকদের হিংস্র থবায় বারবার প্রতারিত আর শোষিত হতে থাকলো। তবু বিপুল উজ্জল সম্ভাবনা আজো আছে এই এলাকার প্রভূত উন্নতির জন্য। সোনাপুর বাজার থেকে চরবাটা রামগতি হাতিয়া টিমার ঘাট প্রায় ২৪/২৫ কিলো মিটার শুধু চর। ছিটে ফোটা কিছু কিছু ঘর বাড়ি। বিপুল বিস্তীর্ণ উর্বর এলাকা । কিছু কিছু এলাকা ছাড়া ফসল হয় মাত্র এক মৌসুমে। অন্য সময় বিপুল এলাকা খালি পড়ে থাকে। তাছাড়া কৃষি নির্ভর কোন খামার গড়ে উঠেনি । নব্য শোষক্রা নব্য জোতদাররা সাধারণ কৃষদের নিয়ে কোন পরিকল্পনাই নেয়নি। এ অঞ্চল কৃষি নির্ভর অঞ্চল। এখানে কৃষি নির্ভর চমৎকার খামার গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু সুষ্ট পরিকল্পনা আর উদ্যেগ প্রয়োজন। কি সেই পরিকল্পনা? কি ভাবে তা সম্ভব?



যা কিছু পরিকল্পনা যা কিছু প্রকল্প সব কিছুই করতে হবে মানুষদের নিয়ে। এই মানুষই শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই মানুষই সম্পদ ফলায় তার অফুরন্ত শক্তি শ্রমে। কি চিন্তায় কি চেতনায় কি শারিরীক শ্রমে। যে শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে উৎপাদন করে সই শ্রমই শ্রেষ্ঠ পুঁজি। যে কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্ত পানি করে শ্রম দিয়ে যে ফসল ফলায় সে শ্রমই শ্রেষ্ঠ পুঁজি। এই পুঁজিকেই প্রাধান্য দিতে হবে সর্বাগ্রে। এই পুজির কোন বিকল্প নেই। সুতরাং এই পুঁজির হিস্যা এই শ্রমের মালিক শ্রমিককে কৃষককে কড়ায় গন্ডায় পরিশোধ করতে হবে সর্বাগ্রে। যে কোন প্রকল্পে এই কৃষকদের অংশ গ্রহণ করতে দিতে হবে সমান সমান। অর্থাৎ উৎপাদিত পন্যের অংশিদারিত্ব দিতে হবে এই কৃষকদের। উৎপাদন ও বাড়তে থাকবে যদি এই কৃষকরা সব উৎপাদনের অংশিদারিত্ব পায়। এটা তাদের প্রাপ্য। সাথে সাথে ওরা নিজেদের চিনতে পারবে। বুঝতে পারবে। উৎপাদনের প্রকৃয়া নিজেরাই আস্তে আস্তে আয়ত্ব করতে পারবে। শিখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। লাভ ক্ষতি নিজেরা শিখতে পারবে। গোষ্ঠী চেতনা জাগ্রত হবে। এ ভাবেইতো সার্বিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। তাদের উপরই তাদের নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দিতে হবে। এই ভূখা নাঙ্গা দিক চিহ্নহীন মানুষগুলো টেনে নিবে একে অপরকে। এই মানুষগুলো কোন দিনই লোভী নয়। নিজের প্রাপ্য পেলে অপরের প্রাপ্যকেও সম্মান করবে কড়ায় গন্ডায়। আঁকা বাঁকা অন্ধকার পিচ্ছিল বন্ধুর পথে খুঁজে পাবে সঠিক গম্ভব্য। এ ভাবে এই কৃষকদের নিয়ে যে কোন প্রকারই উন্নতির চরম শিখরে উঠতে পারবে খুব অল্প সময়েই। কোন দিনই বৃথা যেতে পারে না। এদেরকে খুব মহানুভূতির সঙ্গে আত্নপ্রত্যয়ী করে তুলতে হবে।

আমার এই চিন্তা থেকেই হাতে নিয়েছি একটি কৃষি প্রকল্প। প্রথম শুরু করলাম পরীক্ষা মূলক। সোনাপুর থেকে চরবাটা রাস্তা দিয়ে দুই মাইল দক্ষিনে গেলে চর সল্লায় আমাদের পৈত্রিক খুব ছোট্ট একটি খামার আছে। কয়জন বর্গা চাষি বর্গা হিসাবে জমি চাষ করে। খামারে একটি পুকুর ও তার চারদিকে গড় আছে প্রায় তিন একর জমির উপর। যারা চাষী তারা সবাই নিরক্ষর। গতানুগতিক অভিজ্ঞতা থেকেই ওরা চাষ করে। একেবারে প্রকৃতির উপর নির্ভর করা এবং কোন আধুনিকতা ওদের স্পর্শ করেনি। সবারই চার পাঁচ জন ছেলে মেয়ে। বৌ বাচ্চারা চাষ বাসে তাদের নানা ভাবে সাহায্য করে। এদের আর্থিক পূঁজি প্রায় শূন্য। আশে পাশে অনেক বর্গা চাষি অন্যের জমি চাষ করে। কিছু কিছু অল্প জমির মালিক আছে। তাদের সবার অবস্থাও প্রায় একই রকম। কিন্তু অসম্ভব সৎ ও সাহসী কর্মী এরা । সবারই পূর্ব পুরুষদের অবস্থা ভালো ছিল। কেউ কোনদিন অভাবী ছিল না। নদী সমুদ্র ওদের যতনা সর্বশান্ত করে দিয়ে গেছে ততধীক সর্বশন্ত করেছে নব্য ভূই ফোঁড় শোষক শ্রেনী। আমার প্রকল্পের অংশীদারী এরা এই সব শ্রমজীবি মানুষ। ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করলাম কাজকে। নেমে পড়লাম। কি ভাবে শুরু করা যায় ভাবলাম। আলাপ করলাম অনেকের সঙ্গে। খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম মানুষ গুলোকে। এলাকার সম্ভাবনাকে। এ দেশে কৃষি নির্ভর। এলাকার সবাই কৃষক। তাই পুরোপুরি কৃষি ভিত্তিক প্রকল্পই শুরু করবো সিদ্ধান্ত নিলাম। বাংলাদেশের রূপকতা ও তাত্ত্বিক বিবেচনায় সমৃদ্ধির একমাত্র সোপান কৃষি ক্ষেত্র। একেবার শুরুতে আরম্ভ করলাম এক দেশী গাভী নিয়ে এবং ১০টি দেশি হাঁস ও মুরগী নিয়ে। দেশী জাত নিয়ে আরম্ভ করলাম এই জন্যে যে, সেগুলো লালন পালনে কোন উন্নত ও বিশেষ প্রযুক্তির দরকার পড়ে না। একেবারে দেশীয় আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়া। যদিও উৎপাদন কিছুটা কম। আমার উদ্দেশ্য দুটোই উৎপাদনের সাথে সাথে এই সব কৃষকদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। অতি ধীরে সন্তর্পনে। চুক্তিবদ্ধ হলাম একজনের সঙ্গে। উৎপাদনের অংশিদারিত্বে। অর্থাৎ উৎপাদন যা হবে তার অর্ধেক কৃষদের অর্ধেক আমার। তার শ্রম আমার আর্থিক পুঁজি এবং প্রযুক্তি যোগান দেয়া। শুরু হল উৎপাদন। প্রথমে মাত্র একসের দুধ ও চারটি ডিম। ভাগাভাগী করলাম। তার নানা কাজের মাঝে এটি একটি উদ্বৃত্ত উৎপাদন। শুধু একটু একাগ্রতা আর আগ্রহ। আস্তে আস্তে অনেকে এগিয়ে এলো উৎসাহিত হলো। আট দশ জন সদস্য। কি বিপুল ওদের উৎসাহ। এক এক জনের কাছে তিন/চারটি গাভী ও ১৫/২০টি হাঁস মুরগী। সবই দেশী প্রজাতী এবং এদের রক্ষনা বেক্ষনও খুব সাধারণ। চতুর্দিকে মাঠের ঘাস। খুব একটা কষ্ট সাধ্যও নয়। গড় পড়তা প্রতিটি গাভী থেকে দুধ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ লিটার করে। মোটা মুটি হিসাব করে দেখলাম দুধ ও বাছুর থেকে বৎসরে প্রায় ১০০% লাভ হচ্ছে। যার অর্ধেক কৃষকদের। গরুর গোবর এর সার প্রকল্প থেকে পাওয়া যাচ্ছে জৈবিক সার। হাঁস মুরগী থেকেও এ ভাবে ডিম পাওয়া যাচ্ছে তার অর্ধেক কৃষকদের। প্রাকৃতিক ভাবে লালন পালন করা হচ্ছে। যা প্রাকৃতির ভারসাম্যতাও পালন করা হচ্ছে। পরিবেশের উপরও বিরুপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। অর্থনৈতিক ভাবে সার পাওয়া কৃষকরা একটু যেন আশার আলো খুঁজে পেল। আমিও পেলাম এদের সাথে কাজ করার প্রেরনা। কৃষকরাও কিছু কিছু সচ্ছলতা দেখতে পেল। অল্প কয়দিনের ভিতর এক সুন্দর সুফলতা বয়ে আনলো। যে একা আমি কাজ শুরু করলাম। চুতুদিকে চেয়ে দেখি আমিতো আর একা নই। গ্রামের আশাবদী একদল উচ্ছল মেনতী উৎসাই কৃষক আমার সঙ্গে আছে। চোখে ভেসে উঠলো এক স্বর্ণাগ্রামের ছবি। চকুদিকে সোনালী ফসল। নবান্নের গান। মৌ মৌ করে কাঁচা ধানের গন্ধ। গোয়াল ভরা গরু, মাঠ ভরা ফসল, পুকুর ভরা মাছ। পরিকল্পিত সমাজ লোকল। ফুলে ফলে চতুদিকে ভরপুর। বিদেশী যন্ত্রে নয় একেবারে দেশীয় লোকজ প্রযুক্তি ঢেঁকিতে চিড়া আর পিঠা, চাল তৈরি হচ্ছে। হচ্ছে মুড়ি।



শ্রমতে কোন অবস্থায়ই আর বিফলে দেয়া যাবেনা। কাজ আর কাজ। উৎপাদন আর উৎপাদন। মেয়েরা আর বিনা কাজে কাজহীন বসে থাকবেনা, তারাও কাজ করছে। কুটির শিল্পের নানা দ্রব্য তারা তৈরি করছে। তারা জানছে কি ভাবে আরো ভাল করে স্বাস্থ্য পরিচর্যা করতে হয়। কি করে আরো স্বস্থ্যসম্মত ভাবে শিশু পালন করতে হয়। জানছে কি করে মায়ের কোল থেকে একটি উন্নত জাতীর সৃষ্টি হয়। পুরুষরাও গণ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছে। অবসর এর ফাঁকে ফাঁকে নানা উৎপাদনে নিজেকে সক্রিয় করে তুলছে। কারণ তারা বুঝে গেছে এই প্রকল্পের যা কিছু উৎপাদন আর অংশিদার স্বয়ং তারা নিজেরাই আমাদের যা কিছু উৎপাদন যা কিছু সৃষ্টি তার উপকরণ আমাদের এই দেশেই নিহিত আছে। আমাদের উৎপাদন সংস্কৃতি শিল্প শিক্ষা সব হবে একেবারে দেশজ। এ থেকেই বের হয়ে আসবে অভাবনীয় সৃষ্টি যা এদেশেরই মানুষের কল্যাণ আর উন্নতিতে এক বিরাট অবদান রাখবে। সহায় সম্বলহীন শোষিত মানুষেরা একটু অবলম্বন পেয়ে জীবন ধারনের সব কিছুই ফেরি করছে নিজেরা, নিজেদের সম্পদ থেকে যথা সম্ভব পারছে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় না করে ব্যবহার করছে দেশজ লোকজ সনাতন পদ্ধতি। যেমন পেট্রোল চালিত গাড়ী ব্যবহার না করে করছে ঘোড়ার গাড়ী। মাল পরিবহন ও হচ্ছে ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাতায়তও হচ্ছে। ট্রাকটর ব্যবহার না করে হালের বলদে চাষ হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও রক্ষা পাচ্ছে, অধিক কর্মসংস্থানও হচ্ছে। শিশুদের জন্য একটি উম্মুক্ত স্কুল। গাছ লতাপাতা ছায়া কুঞ্জে ঘেরা উম্মুক্ত স্থানে শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ছে শিখছে। আমাদের দেশে সাধারণত বর্ষায়ত্ত স্কুল চলে। কিন' গ্রাম বাংলায় ভরা বর্ষায় এ স্কুল চলবেনা। স্কুল হবে শুকনা মৌসুমে যখন বৃষ্টি থাকবেনা। স্কুলটি থাকবে লোকালয়ের ঠিক মাঝখানে। কোন বাধা ধরা নিয়ম নেই। কাজের ফার্দে যে যেখন আসছে পড়ছে। নিজের তাগিদেই। কোন শাসন নেই তাই ভয় ও নেই। সব কিছুই হবে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোন অবস্থাতেই যেন উৎপাদনের কোন ক্ষতি না হয়। যিনি শিক্ষক তিনি আবার প্রকল্প পরিচালক অথবা কর্মী।



কুড়ি পঁচিশটি ছোট ছোট কৃষদের ঘর নিয়ে এক একটি ইউনিট। এদের সব প্রধান নিয়ন্ত্রক সেল। এ ভাবে গড়ে উঠছে একটি মহল্লা, একটি প্রকল্প, একটি সমাজ কাঠামো। যথ বেশী শ্রম তত বেশী আয় কেউ বেকার নয়। বেঁচে থাকার নুন্যমত প্রয়োজন মেটানো হলো। এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে আরো উন্নত জীবন। ধাপে ধাপে, আস্তে আস্তে করে। সে সমাজের ভিত্তি নেই, সেখানে উন্নতিত প্রশ্নই উঠেনা। সুতারাং সর্বাগ্রে ভিত্তি।

মাটি আর শ্রম কৃষি শিল্প উৎপাদনের মুল পুঁজি। অর্থ এর সহায়ক পুঁজি মাত্র মাটির সঙ্গেই মানুষের আছে নিবিড় সম্পর্ক। মানুষ তার সর্বশক্তি দিয়ে শ্রম দিয়ে মাটি কর্ষন করে চাষের জমি তৈরি করে। তারপর বীজ বপন, সার প্রয়োগ, রোগ জীবানু থেকে কীট পতঙ্গ থেকে ফসল কে রক্ষা করে। এই সবের জন্য দরকার আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও উপকরন। তার জন্য প্রয়োজন হয় অর্থের। জমি থেকে উৎপাদিত যে পন্য পাওয়া গেল তা থেকে অবশ্যই সব খরচ উঠে আসতে হবে। মোটামুটি বাজার মূল্যে ফিরে আসলে তবেই তার উৎপাদন সফল বলা যাবে।



যেমন একজন কৃষক এক একর জমিতে চাষ করার জন্য তার শ্রম ব্যবহার করলো। তার পর তার প্রয়োজন হবে উপকরণের। তার জন্য চাই অর্থ। কারো কাছ থেকে ধার হিসাবে সে তা গ্রহণ করলো তৃব্য থাক তার ৩,০০০/- টাকা প্রয়োজন হলো। সুদে আসলে তাকে ফসল উঠার পর ৪,০০০/- টাকা ফেরত দিতে হবে। তার কায়িক শ্রম ৩০ টি শ্রম তাকে দিতে হলো। প্রতি শ্রম ৫০ টাকা করে ১,৫০০/- টাকা ধরা হল। এখন তার খরচ হল ৫,৫০০/- টাকা। ফসল উঠার পর দেখা গেল ৪০ মন ধান পাওয়া গেল। ২৫০/-টাকা করে যার মূল্য হবে ১০,০০০/- টাকা। ধার শোধ করে তার .........৪,৫০০/-টাকার ফসল। দেখা যাচ্ছে একজন কৃষক তার ১,৫০০/- টাকার শ্রম দিয়ে ৪,৫০০/- টাকার ফসল উৎপাদন করলো। উদ্বৃত্ত হলো ৩,০০/- টাকা এটা একেবারে চুলচেরা হিসাব নয়। মোটামুটি হিসাব। দেখা যাচ্ছে একজন কৃষকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক মার্টির সঙ্গে। মাটির সাথে তার শ্রম দিয়ে মিলে মিশে উৎপাদন করতে হয়। অর্থটা তার সহায়ক পুঁজি মাত্র। কিন' মূখ্য নয়। ধান উৎপাদনকে একটি উদাহরণ টানা হলো মাত্র। কিন' গ্রাম বাংলার অনেক পন্য আছে যা সরাসরি শ্রম দিয়ে উৎপন্ন করা যায়। কুটির শিল্প মধু চাষ শাক সবজি চাষ, মৎস চাষ, দুগ্ধ উৎপাদন এমন অনেক কিছুই উৎপাদন করে এক বিপুল অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করা সম্ভব।



এই কৃষকদের যদি কৃষি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে শিক্ষিত করা যায়। তাহলে তারা কি ভাবে আরো উৎপাদন করা যায়। তা তারা শিখবে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়। তাদের কাজের মধ্যেই তা করতে হবে। তারাও বুঝে, তাদের তা করতে হবে, শিক্ষিত হয়ে উঠেতে হবে। তারা তার প্রতিফলন দেখতে চায় তার সন্তানের ভিতর। অবস্থাপন্ন সচেতন কৃষক চায় তার সন্তান শহরে গিয়ে শিক্ষিত হয়ে আসুক, গ্রাম উন্নয়নে উৎপাদনে সক্রিয় কাজে লাগুক। কিন' দেখা যায় তার উল্টো। যে সন্তান গ্রাম থেকে সরাসরি শহরে একটি বুর্জুরা মুৎসুদ্দি পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করলো সে আর গ্রাম মূখী হচ্ছে না। হয় সে সরকারী বে-সরকারী অফিসের ঘুষখোর কেরানী হচ্ছে। না হয় বিদেশ পাড়ি দিয়ে ড্রেন নর্দমা ময়লা পরিষ্কার করার কাজ নিচ্ছে। যারা তা পারছেনা তারা ফুলবাবু সেজে সখের বেকার হয়ে অন-উৎপাদনশীল ব্যপক জনগোষ্টির কাতারে নিজের নাম লেখাচ্ছে। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই তরুনেরা আর গ্রাম মুখী হচ্ছে না। কিংবা তাদেরকে গ্রাম মুখীতা করা যাচ্ছে না। যে মাটি থেকে তারা উঠে এলো সে মাটিই যেন তাদের অস্পৃশ্য হয়ে উঠলো। এমনটি হোলো কেন? মাটির সঙ্গে এদের সম্পর্ক চ্যুতির জন্যই। অথচ এই বিশাল তরুনেরা বিপুল শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজেরাই গ্রাম বাংলার অর্থ নৈতিক উন্নতিতে এক বিশাল অবদান রাখতে পারে। শুধু একটু সদিচ্ছা, মাঠির সঙ্গে হৃদয়ের সঙ্গে মায়া-মমতায় একাত্নতা হয়ে যাওয়া। এদেশের মাটি অনেক উর্বর। এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ গুলো মাটির মতই সরল সাধারণ। ছেঁড়া পাল তোলা ডিঙি নৌকায় অইথ সমুদ্রে ভাসমান সবুজ দ্বীপ প্রত্যাশী ক্লান্ত নাবিক। এদের সঠিক হাল ধরে টেনে আনতে হবে তীরে।



শতাব্দীর পর শতাব্দী পরাধীনতা শোষন অবহেলায় যে জাতী তার অতীত হারিয়ে ফেলেছে, যে ঐতিয্য ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে, তাকে আবার খুঁজে তুলতে হবে। আনতে হবে সম্মুখে। একেবারে পেছন থেকে। সময় আজই, এখই।







No comments:

Post a Comment

About Me

My photo
Mahmudul Huq Foez Free-lance journalist, Researcher.