Scrollwhite

মাহমুদুল হক ফয়েজ My name is Mahmudul Huq Foez, I am a journalist, leaving in a small town, named Noakhali , which is situated in coastalzila of Bangladesh

হোমপেইজ | আর্টিকেল | ছোটগল্প | ফিচার | মুক্তিযুদ্ধ | বনৌষধি | সুস্বাস্থ্য | কবিতা | যোগাযোগ

হাঁসের রাজা





হাঁসের রাজা শহর আলী

মাহমুদুল হক ফয়েজ

এক বুক জল নিয়ে এঁকেবেঁকে তিতাস নদী ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার কোল ঘেঁষে চলে গেছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তেনাসিরনগর উপজেলার কাছে এসে একবার বেঁকে গেছে তিতাস। যে জায়গাটিতে এসে বাঁক খেয়েছে তার নাম হরিণ বেড়ের বাঁক 

কী জানি কখনো এখানে হরিণ বাস করত কি না। তবে জনশ্রুতি আছে, বর্ষায় এখন যেখানে জল থৈ থৈ করে, যে দিকে চোখ যায় শুধু হাওরের মধ্যে ঢেউয়ের অবিরাম নাচন, সেখানে এক সময় ছিল জঙ্গল। সেখানে চরে বেড়াতে দলে দলে মায়াবি হরিণ। সেই থেকে এর নাম হরিণ বেড়। কিন্তু' এগুলো হয়তো সত্যি নয়, হয়তো সত্যি কিংবা কিংবদন্তি
তবে এখন বাস্তবে সত্যি সত্যি দেখা যাবে জল ছল ছল হাওরের নীল জলে ভেসে বেড়াচ্ছে  অসংখ্য পাতিহাঁস। নদী ছাপিয়ে পাশের অগভীর বিলে হাঁসেরা ডুবছে, ভাসছে। ডুব দিয়ে শামুক তুলে ওপরে গলা বাড়িয়ে গিলছে। আবার ডুব দিচ্ছে। হয়তো দেখা যাবে অদূরে ডিঙ্গি নৌকায় বসে পাহারা দিচ্ছে হাঁসের রাখাল। হাওর অঞ্চলে হাঁস পালন এখন অনেকেরই লাভ জনক পেশা।




                হরিণ বেড়ের ঘাট থেকে নাসির নগর উপজেলা সদরে হাওরের বুক চিরে চলে গেছে এলজিইডির বেড়িবাঁধ। যাকে বলা হয়, ‘জি. সি.আরবা গ্রোথ কানেকটিং রোড। এক কথায় বলা যায়, লিস্ক রোড। ওই বেড়িবাঁধের পাশে ১ হাজার ২০০ হাঁসের এক বিশাল সম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন চল্লিশোর্ধ এক হাঁসের রাজা শহর আলীসকালে সূর্য ওঠার কিছু পরে নরম রোদ মেখে মেখে হাঁসেরা সদর রাস্তা ধরে দীপ্ত পায়ে ছুটে যায় হাওরের দিকে। হাঁসের চলার গতি দেখে তখন মনে হয এক দল নির্ভিক রাজা দীপ্ত পায়ে ছুটে চলছে এক অজানা রাজ্য জয়ের উদ্দেশে। পেছনে ছুটে আসছে কাঁধে বন্ধ ছাতা ঝুলিয়ে হাঁসের রাজা শহর আলী। এই হাঁসদের প্রতিদিন শহর আলী নিয়ে যায় দুরে হাওরের বিলে। সেখানে পাওয়া যায় অসংখ্য শামুক। তার সঙ্গে থাকে আরো দুজন সহযোগী। বিশাল হাওরের ১ হাজার ২০০ হাঁস ছেড়ে দিয়ে সারা দিন শেষে সন্ধ্যায় ফিরিয়ে আনা কি চাট্টিখানি কথা! শহর আলী জানান, হাঁসেরা  দলচুট হয় না। সামনের হাঁস  যেদিকে যায় সব হাঁসই তার পথ ধরে । শহর আলী শুধু হাঁক দিয়ে দিয়ে সামনের রাস্তা ধরিয়ে দেয়। হাঁসগুলোও ঠিক ঠিক সামনের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। বেড়িবাঁধের পাশে ঢুলি বাঁশের বেড়ার ঘের দিয়ে বানানো হয়েছে হাঁসের অস্থায়ী ঘের। সারা রাত হাঁসেরা সেই ঘেরের মধ্যে থাকে। শহর আলী তার পাশে  নৌকার ছইয়ের মতো গোল করে  ছাপরা ঘর বানিয়ে সেখানে তাদের পাহারায় থাকেন তারা তিনজন পালাক্রমে পাহারা দেন রাতভর। শহর আলী জানান চোরের কোনো উপদ্রব নেই। তবে  উপদ্রব আছে বন বিড়ালের। স্থানীয়রা বলে,‘টোলা বিলাইএই টোলা বিলাই মাঝে মধ্যে হানা দেয। একবার বেড়া ভেঙ্গে ঢুকে তিন-চারটি হাঁস মেরে ফেলেছিল।
শহর আলী জানান, তিনি কোনো দিন পড়ালেখা করেননি।লিখতে পড়তে জানেন না। তার মূল বাড়ি পার্শ্ববর্তী বুড়িশ্চর ইউনিয়নে। তার নিজস্ব দেড় একর জমি আছে। হাওরের মধ্যে  সে জমিতে সামান্যই চাষ হয়। বাবা মৃত আরজু মিযা এটা-ওটা কাজ করতেন। বাবার সঙ্গেই থাকতেন শহর আলী। বাবা মারা যাওয়ার পর ডিমের ব্যবসা শুরু করেন। তার থেকে ডিম নিয়ে অনেকেই তুষের ভেতরে ডিম রেখে বাচ্চা ফুটাত। অনেকে আবার গ্রামীণ পদ্ধতিতে মুরগির নিচে তাদিয়ে হাঁসের বাচ্চা ফুটায়। শহর আলী দেখেন এতে ডিম বিক্রির চেয়ে লাভ একটু বেশি। শহর আলী  সে কাজটিই কিছুদিন করেছিলেন। তারপর ভাবলেন, হাঁসের খামার করলে কেমন হয়। নিজের ঘরেই তুষের মধ্যে ডিম রেখে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে শুরু করলেন খামার। যত্ন আত্তিতে বাচ্চাগুলো বড় হলো। ধীরে ধীরে তার খামারও বড় হতে লাগল। ৭৫ সাল থেকে শহর আলী ডিমের ব্যবসা করেন। তিনি জানান, তখন ডিমের হালি ছিল ১২ আনা। হাসের খামার যখন প্রথম শুরু করেন তখন তার হাঁসের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। ধীরে ধীরে সেটি বেড়ে এখন হয়েছে এক হাজার দুইশতেশহর আলী জানান, প্রতিদিন গড়ে খামার থেকে সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ ডিম পাওয়া যায়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে ডিম তার কাছ থেকে কিনে নিয়ে যায়। তার  খামারে ছয়জন নিয়মিত কাজ করে। প্রত্যেককে খাওয়া দাওয়া দিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেতন দেওয়া হয়। কর্মচারীর বেতন, ঔষধ খরচ বাদ দিয়ে তার লাভ হয় মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। শহর আলী জানান, লোকসান তেমন নেইতবে মাঝে মধ্যে লাভ কমে যায়। তার মুখে মুখেই হিসাব। লাভ যা হয় সংসার আর খামারের খরচ হয়। খামার ও দিন দিন বড় হচ্ছে। লাভ যেমন হয়, তাকে কষ্ট ও করতে হয় খুব। শহর আলী বলেন, এ কাজে বেতালা মিন্নত, বারিষাত পানিতে কামড়ায়। বাইনে বাইনে থাইকলে জ্বর জারি অয়শহর আলীর অসুখ বিসুখ হলে গ্রামের রাখাল ডাক্তারের ওপরই ভরসা। শহর আলী বলেন,’ ‘রাখাল ডাক্তার কিতা কিতা ঔষুধ দেয়, খাইলে বালা হইয়ে যায় 

হাওর অঞ্চলে হাঁস পালনে আছে এক বৈচিত্র্য। শহর আলীর গ্রামের আরো ১৪-১৫টি ছোট ছোট  খামার আছে। এদের মধ্যে তার খামারটিই সবচেয়ে বড়। এই নাসির নগরের উত্তরে আছে আরো বড় বড় হাওর। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিং, সরাইল, ধরন্তি, লাখাই প্রভৃতি হাওরাঞ্চল। এগুলোর ছয় মাসই পানিতে ডুবে থাকে। পূর্ব ভাগের লাগ-উত্তরে মেদীর হাওর। এই বিশাল অঞ্চলে শুকনো মৌসুমে ধানের চাষ হয়। তখন বুঝাই যায় না এক সময় এখানে এত পানি ছিল।  মনে হয় বর্ষা শেষে কোনো পাতাল দেবতা বুঝি এক চুমুকে পানিগুলো গিলে নিয়েছে। তবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সব হাওরে একই সময়ে পানি কমে না। উত্তর দিক থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। উত্তর দিকে যখন পানি কমতে থাকে তখন শুকনো হাওরে হাঁসের খাওয়া কমে যায়। সে সময় খামারিরা দক্ষিণে ভাটি অঞ্চলের খামারিদের কাছে হাঁস বিক্রি করে দেয়। উজানের বিল যখন শুকনো, ভাটিতে তখন ঝিরি ঝিরি পানি। ভাটিতে হাঁসের খাওয়া পাওয়া যায় প্রচুর। উজানে তখন টান ময়ালআর ভাটিতে তখন ডুবা ময়াল। এই ডুবা ময়ালে হাঁসেরা সাচ্ছন্দে বিচরণ করে।
 বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে হাঁসের খামারিদের মধ্যে রয়েছে চমৎকার লেনদেনের পালা। এতে নিজেদের হাঁসগুলো আদানপ্রদান হয়। শীতে উজান যখন শুকিয়ে যায় সে সময় হাঁসদের খাওয়া কমে যায়। তখন খামারিরা ভাটি অঞ্চলের খামারিদের কাছে হাঁস গুলো বিক্রি করে দেয়।  আবার যখন বর্ষায় উজানে আগেভাগে পানি আসে তখন ভাটি অঞ্চলের খামারিরা ফের উজানের খামারিদের কাছে হাঁসগুলো ফিরতি বিক্রি করে দেয়।
 হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন খামারিয়া জানিয়েছেন, পাঁচ বছর পর্যন্ত হাঁসগুলো ডিম দেয়। তাই তারা পাঁচ বছরের বেশি খামারে হাঁস রাখে না। শহর আলী নিজে পড়ালেখা না করলেও তার ছেলেমেয়দের পড়ালেখা শেখাচ্ছেন। তার চার ছেলে আর একমাত্র মেয়ে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। বাকি দু ছেলে এখনো ছোট। তার স্ত্রী হাজেরা খাতুন আরবি পড়াশোনা জানেন। তার ইচ্ছা ছেলে মেয়েদের সবাইকে পড়ালেখা করাবেন। পূর্ব ভাগ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ আহমেদ জানিয়েছেন, এ অঞ্চলে হাঁসের খামার করার যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে। বর্ষার এখানে প্রচুর প্রাকৃতিক আহার পাওয়া যায়। বিনা পয়সাতেই এগুলো পাওয়া যায়। খামারিরা অনেকেই জানান, সরকারির তেমন কোনো সহযোগিতা তারা পায় না। একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে তারা প্রতি হাঁসের জন্য ৫০ পয়সা হারে টিকার ব্যবস্থা করে।

শহর আলী জানান, হাওরে পানি কমে গেলে জমির মালিকরা জমিতে ধান রোপন শুরু করে। তখন হাঁসের চলাফেরায় বেশ সতর্ক থাকতে হয়। জমিতে জালা তৈরির জন্য যখন ধান ছিটানো হয় তখন খুব বেশি সাবধান হতে হয়। সে সময় তারা সে জমির পাশ দিয়ে হাঁস নিয়ে যান না। ধানগাছ একটু বড় হলে আইলের মধ্য দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে হাঁসেরা চলাচল করে। কোনো অবস্থাতেই তারা ছোট চারাগাছের জমিতে নামে না। এখানে আর একটি ব্যাপার লক্ষনীয় যে, ধান গাছ যখন বড় হয় তখন ধানের গোছার ফাঁকে ফাঁকে হাঁস গুলোকে চরতে দেয়া হয়। কারণ ধানে যদি কখনো পোকা লাগে তখন হাঁসেরা সে পোকা খেয়ে ফেলে। ধানের গোড়ায় গোড়ায় হাঁসদের চলা চলের ফলে প্রাকৃতিক ভাবে নিড়ানির কাজও হয়। হাঁসদের বিষ্ঠায় জমির ঊর্বরতা বাড়ে। এতে ফসল ভালো হয়।  

     শহর আলীর ভাষা ও ইঙ্গিত হাঁসেরা স্পষ্ট বুঝতে পারে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, হাওরের মধ্যে বিশাল এলাকায় হাজার হাজার হাঁস নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায় আদারখুঁজে খায়। নিদিষ্ট সময়ে শহর আলী ডাক দিলে সবকটি এসে এক জায়গায় জড়ো হয়। সন্ধ্যা নামার আগেই হাঁসেরা দলবেঁধে ফিরে আসে তাদের আস্তানায়। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, এ অঞ্চলে বড় আকারের খামারি ছাড়াও প্রায় সব গৃহস্ত বাড়িতে হাঁস পালন করে। 

                হাঁস পালন করেই শহর আলী আজ আত্ননির্ভরশীল হয়েছেনএকজন সফল খামারি হিসাবে এলাকায়  এখন তিনি সবার পরিচিত

মাহ্মুদুল হক ফয়েজ
সেলঃ- ০১৭১১২২৩৩৯৯
e-mail: mhfoez@gmail.com           

              


No comments:

Post a Comment

About Me

My photo
Mahmudul Huq Foez Free-lance journalist, Researcher.